“পার্বত্য ভিক্ষু সংঘ বাংলাদেশ”র সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।।jumnews24cht.wordpress.com blog

————————————————————

——

রিবেং চাকমা’র লেখা jumnews24cht.wordpress.com blog এখানে প্রকাশিত হল।।
‘পার্বত্য ভিক্ষু সংঘ বাংলাদেশ’ একটি গৌরবদীপ্ত   নাম ও একটি ইতিহাস। সদ্ধর্ম প্রচার-প্রসার ও মানব সম্পদ উন্নয়নমূলক একটি ধর্মীয় সংগঠন।  এ সংগঠনের মূল উদ্দেশ্যই হলো পার্বত্য অঞ্চলের প্রতটি ঘরে  ধর্মীয় শিক্ষার আলো দেয়া তার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষা ও প্রযুক্তিবিদ্যার শিক্ষা দিয়ে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা।
এ মহান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন মহাপণ্ডিত, বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, সমাজ সংস্কারক, পার্বত্য অঞ্চলে সদ্ধর্ম পুনঃজাগরণের অগ্রদূত, রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথের। তাঁরই পুণ্যহস্তে পঞ্চাশের দশকে এ সংগঠনটি “পার্বত্য চট্টগ্রাম ভিক্ষু সমিতি” নামে আত্মপ্রকাশ করে। যার পরিবর্তিত নাম এখন “পার্বত্য ভিক্ষু সংঘ বাংলাদেশ’। 
প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে এ সংগঠনটি সদ্ধর্ম প্রচার — প্রসার ও শিক্ষা বিস্তারের জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। এ সংগঠনের নিরলস প্রচেষ্টায় সমাজ এবং জাতি আজ বহু উপকৃত হয়েছে। যাঁদের অবদানে সংগঠনটি তার লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে তাঁদের প্রত্যকের নাম উল্লেখ করতে গেলে তালিকাটি বহুলম্বা হবে বিধায় সেদিকে অগ্রসর হলাম না। তারপরেও যে কয়েকজন  প্রাতঃস্মরণীয় সংঘ মনীষার সম্পৃক্তায় সংগঠনটির সাংগঠনিক শক্তভিত রচিত হয়েছিল তাঁদের নাম উল্লেখ না করলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে সেকারণে শুধুমাত্র কয়েকজনের নাম এখানে তুলে ধরলাম। এঁরা হলেন- পার্বত্য চট্টগ্রামে আধুনিক শিক্ষার আলো বিস্তারের পথিকৃৎ, উপসংঘরাজ জ্ঞানশ্রী মহাথের(বর্তমান চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ) সংঘরাজ সুগত প্রিয় মহাথের, সংঘরাজ অভয় তিষ্য মহাথের, সাদামনের মানুষ, উপসংঘরাজ তিলোকা নন্দ মহাথের, কর্মবীর বিমল তিষ্য মহাথর, কর্মযোগী প্রজ্ঞানন্দ মহাথের, কর্মবীর সুমনালংকার মহাথের, শ্রদ্ধালংকার মহাথের, সত্যানন্দ মহাথের প্রমুখ।
পার্বত্য ভিক্ষু সংঘ বাংলাদেশ’র উল্লেখযোগ্য অর্জন সমূহঃ

১. সর্বজন পূজ্য বনভন্তের উপসম্পাদার সময় পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের ভূমিকা ছিল অনন্য  সাধারণ।  পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের প্রতিষ্ঠাতা মহাপণ্ডিত, রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথের ও উপসংঘরাজ জ্ঞানশ্রী মহাথের এ দুই সংঘ মণীষা ছিলেন বনভন্তের উপসম্পাদা গুরু। কাজেই বনভন্তে হলেন পার্বত্য ভিক্ষুদেরই একজন যোগ্য উত্তরসূরি। তাঁর শিষ্যমণ্ডলীরা এখন দেশের গণ্ডী পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও সদ্ধর্ম প্রচার করে যাচ্ছেন। রাজবন বিহার থেকে ত্রিপিটক গ্রন্থসমূহ প্রকাশ করা এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। 
২. পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম, মোন ঘর শিশু সদন, কাচালং শিশু সদন, বনফুল চিলড্রেন হোম, বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজ, বোধিচারিয়া শিশু করুণা সংঘ(পশ্চিম বঙ্গ ভারত), গিরিফুল শিশু সদন প্রভৃতি জন কল্যাণ মূলক প্রতিষ্ঠান সমূহ গড়ে তুলেছেন পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের এক একজন দিকপাল সদস্য। সমাজের বহু হতদরিদ্র, ছিন্নমূল, অসহায়, অবহেলিত, অনাথ শিশু এ জনহিতকর প্রতিষ্ঠান সমূহের মাধ্যমে শিক্ষা দীক্ষা লাভ করে নিজেরা যেমন প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন তেমনি জাতিকে আলোকিত করেছেন। এযাবতকাল এ সকল প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষা লাভ করেছে এবং কয়েক শতজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল বের হয়েছে। এরা সকলেই এখন সমাজে প্রতিষ্ঠিত।
এছাড়াও ৭২ জন শিশুকে ফ্রান্সে পাঠিয়ে পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের দু’জন সদস্য বিমল তিষ্য মহাথের ও প্রজ্ঞানন্দ মহাথের  বিরল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন। এ ৭২জন এখন সবাই ফ্রান্সের মত উন্নত দেশের গর্বিত নাগরিক।
ফ্রান্সবাদেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের যে সমস্ত আদিবাসী রয়েছেন এদের মধ্যে অধিকাংশের ক্ষেত্রে পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে অবদান রয়েছে।
৩. পার্বত্য ভিক্ষু সংঘ বংলাদেশ পার্বত্য চট্টগ্রামের আনাচে কানাচে বুদ্ধের শিক্ষা সরিয়ে দেয়ার লক্ষে বহু বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁদের এ সদ্ধর্ম অভিযান বর্তমানে দেশের সীমানা অতিক্রম করে ভারত, আমেরিকা ও কানাডাতে বিস্তৃতি লাভ করেছে।
৪. পার্বত্য ভিক্ষু সংঘ ধর্মীয় শিক্ষার পাশা-পাশি আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা দিয়ে সমাজকে অার্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলেছে।
৫. জাতির সুখে দুঃখে পার্বত্য ভিক্ষু সংঘ সর্বদা পাশে দাঁড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এধারা অব্যাহত থাকবে।
আশা- নিরাশাঃ পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের এতগুলো সাফল্য কখনোই সহজভাবে অর্জিত হয়নি। বহুবাধা বিঘ্ন অতিক্রম করতে হয়েছে। সমাজের অনেক গণ্যমান্য ও অভিজাত শ্রেণির মানুষেরা পার্বত্য  ভিক্ষু সংঘের এ জন কল্যাণ মূলক কার্যক্রমকে ভাল চোখে দেখেননি। অনাথ আশ্রম , স্কুলকলেজ প্রতিষ্ঠা করা নাকি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের কাজ নয়। শুধু সাধারণ মানুষ কেন খুট বনভন্তেও এটির চরম বিরোধীতা করেছিলেন।
আমি কিন্তু মোটেই বনভন্তেকে অশ্রদ্ধা বা অসম্মান করি না। তিনি আমার অতীব শ্রদ্ধারপাত্র। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমি তাঁর দ্বিমত পোষণ করি। যেমন তিনি যেভাবে তাঁর শিষ্য সংঘকে গড়ে  তুলতে চেয়েছেন বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে তা কোনভাবেই সম্ভব নয়। তার কারণ ত্রিকালদর্শী বুদ্ধও মহাপরিনির্বাণ লাভের পূর্বে স্বয়ং তাঁর শিষ্যদেরকে বলে গেছেন হে ভিক্ষুগণ! প্রয়োজন হলে স্থান-কাল-পাত্র ভেদে বিনয়ের ক্ষুদ্রানু ক্ষুদ্র শিক্ষাপদগুলোর পরিবর্তন করা যাবে।
একারণে দেখা যায় বৌদ্ধ প্রতিরূপ দেশগুলোতেও  যুগের সাথে সামঞ্জয্য রেখে বুদ্ধের অনেক বিনয় তারাও পরিবর্তন করেছেন।

তাঁদের এ যুগোপযোগী পদক্ষেপের কারণে আমাদের তুলনায় তাঁরা অন্তত দুই শত বছর এগিয়ে গেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার প্রসারে 

অদ্বিতীয় স্থান অধিকার করে আছেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় বনভন্তে। তাঁর মত তেজস্বী ও মহান ত্যাগী পুরুষ ভবিষ্যতে উৎপন্ন হবেন কিনা সন্দেহ। তাঁর সব কিছু ঠিক থাকলেও কিন্তু একটা জায়গায় আমার মনে হয় আরো একটু গভীরভাবে ভাবা উচিৎ ছিল। সেটা হচ্ছে আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য মানুষকে উৎসাহিত করা। অবশ্যই শেষ পর্যায়ে এসে তিনি এটা উপলব্ধিতে করতে পেরেছেন বটে কিন্তু এর স্বপক্ষে জনসম্মুখে জোরালো কোন বক্তব্য তুলে ধরেন নি।  এক কথায় বলতে গেলে বর্তমান সময়ে এ শিক্ষা না থাকলে একেবারেই অচল। অনেকে হয়ত বলতে পারেন বনভন্তে এ সমস্ত লৌকিক বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাবেন কেন? কেউ যদি এরকম যুক্তি দেখায় তাহলে আমার মনে হয় আমরা আরো এক শতবৎসর পেছনে চলে যাবো। কারণ বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে আমাদের অস্তিত্ব অচিরেই পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। জাতির অস্তিত্বই যদি না থাকে তাহলে ধর্ম টিকবে কিভাবে? পার্বত্য ভিক্ষু সংঘ এর গুরুত্ব সেই পঞ্চাশ দশকেই উপলব্ধি করেছিল।
পার্বত্য ভিক্ষু সংঘ থেকে বন ভিক্ষু সংঘের উৎপত্তি হলেও কিছু কিছু কারণে এ দুই সংঘের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে পার্বত্য ভিক্ষু সংঘ যে উদ্দেশ্য লক্ষ নিয়ে অগ্রসর হতে চেয়েছিল সেটা বনভন্তে সরাসরি বিরোধিতা করেছিলেন। যার কারণে এ বিরূপ প্রভাব সাধারণ দায়ক দায়িকাদের মধ্যেও সরিয়ে পড়ে। এটা আমাদের জন্য বিরাট ক্ষতি হয়েছে।

 

অতীতের ভুল থেকে এখনোই আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিৎ। একে অপরকে দোষারোপ, বিরোধিতা না করে যার যার অবস্থান থেকে শোষক হিসেবে নয়, সদ্ধর্মের সেবক হয়ে সমাজ ও জাতির কল্যাণে কাজ করে যাওয়া।
পার্বত্য ভিক্ষু সংঘ সমাজের জন্য অনন্য সাধারণ অবদান রাখলেও কতিপয় লোক ছাড়া তা কেউ মনে রাখে না। তবুও তাঁরা তাঁদের লক্ষে অবিচল থেকে সমাজ ও জাতির কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁদের এ কল্যাণমূলক কার্যক্রমকে বিরোধীতা না বরং উৎসাহিত করলে তাঁরা সমাজকে আরো বহুকিছু দিতে পারবে।
আমরা আশাবাদী মানুষ। পার্বত্য ভিক্ষু ও বন ভিক্ষুর মধ্যে যে দূরত্ব রয়েছে তা এ মুহূর্তে মিটমাট করা উচিৎ। এ দুই সংঘের মহা মিলনই পারে সমাজ ও জাতিকে বহুদূর এগিয়ে নিতে। চির প্রবাহমান বিভিন্ন নদীর জল যেমন সমুদ্রে পতিত হয়ে একই রূপ ধারণ করে তেমনি চলো আমরাও  সবাই একীভূত হয়ে যায়। নচেৎ মহাকালের অতল গহ্বরে বিলিন হয়ে যাবো।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s